বাবা শুধু একজন মানুষ নন…

বাবা শুধু একজন মানুষ নন, স্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো বয়সী সন্তানের হূদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এতো দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ এতো অল্প সময়ে কি করে এতো শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা। আর বাবার ছায়া …?

WP_20150531_17_55_14_Pro (1) - Copy

সেটাও শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চাইতেও বড়। বড় যদি না হবে তবে জীবনের এতো উত্তাপ থেকে কি করে সন্তানকে সামলে রাখেন বাবা আর বাবার চোখ? সেটাও কি দেখতে পায় কল্পনার অতীত কোনো দূরত্ব। তা না হলে কি করে সন্তানের ভবিষ্যত্ ভাবনায় শঙ্কিত হন বাবা। সত্যি বলতে কি বাবাকে নিয়ে আমরা কেউই এমন করে কখনও ভাবি না। শুধু আমাদের বাবা, শত সাধারণের মাঝেও অসাধারণ হয়ে ওঠা আমাদের জনক, আমাদের অকাতরে ভালোবেসে যান তার সামর্থ্যের শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে। উজাড় করে দেন তার সবকিছুই শুধু তার সন্তানের জন্য। তার যা কিছু আছে নিজের জন্য আর অবশিষ্ট রাখেন না কোনোভাবেই। সবকিছু উজাড় করে দেয়ার পরও তাকে কোনোভাবে নিঃস্ব বলে মনে হয় না। মনে হয় তিনি যেন পরম তৃপ্তিতে আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। বরং শ্রমে ঘামে স্নেহে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করে তুলতে সচেষ্ট বাবা মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যেও ফরিয়াদ জানান তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য। আর বাবার সেই আহ্বান হয়ত গর্বিত করে তোলে অন্তর্যামীকেও।

মনে রাখবেন, সন্তান যত বড়ই হোক না কেন তার অভিমান আর অবহেলার পরিমাণ যত বিশালই হোক বাবার স্নেহ সবসময় তার জন্য এক পরম আশ্রয়। বেঁচে থাকার আনন্দে, কষ্টের তীব্রতায়, কঠিন সমস্যায় বাবাই হয়ে ওঠেন বিপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা সহায়। অন্যদিকে সন্তান হিসেবে আপনাকে ভাবতে হবে বাবার কথা। তার আবেগ অনুভূতি আর পরিণত বয়সের চাওয়া পাওয়াগুলোর দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। যে বয়সে স্কুল-কলেজে নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সময়গুলো বেশ জমে উঠেছে সে সময়টাতে ভুলে যাওয়া চলবে না পুরনো বন্ধুকে। বরং পুরনো দিনের কথা মনে রেখে নিজের জীবনের এই খোলস ছাড়াবার মুহূর্তে যদি বাবাকেও সঙ্গী হিসেবে নেয়া যায় তাহলে বরং চেনা বন্ধুরাও নতুন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে জীবনের কঠিন পথে হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকিটা কমে। আবার যারা পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দিব্যি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন আয়-উপার্জন শুরু করেছেন তাদেরকেও সময় করে ভাবতে হবে বাবার কথা। অফিসের ব্যস্ততা আর নানা ঝামেলার মাত্রাটা যতই সীমা ছাড়িয়ে যাক না কেন বাড়িতে ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও তার পাশে বসতে হবে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে।

বাবার জন্য সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। সীমাবদ্ধ বলয়ে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার অবিরাম ধারা বয়ে চলে বছরের প্রতিটি দিন। জীবনের ঘানি টানতে টানতে বাবা এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হন, বার্ধক্য তাকে গ্রাস করে। তখন তিনি হয়ে পড়েন অনেকটা অসহায়, দুর্বল। রোগব্যাধি তাকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। এ সময় বাবা চান সন্তান যেন তার পাশে থাকে। সব সময় যেমন তিনি ছিলেন সন্তানের পাশে তার সব প্রয়োজনে পাশে, যখন সন্তান ছিল শিশু অবস্থা। সন্তানের কাছ থেকে অবহেলা কিংবা দুর্ব্যবহার পেলে বাবার হূদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশেও আজকাল বেশ ঘটা করেই বাবা দিবস পালিত হয়ে থাকে। বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উত্সর্গ করা হয়ে থাকে। যদিও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উদযাপনের প্রয়োজন হয় না। তার পরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশে এখন বাবা দিবস পালন করা হয়। তাই বলে এ ধরনের দিবসগুলো যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় তা কিন্তু বলা যাবে না। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা সীমাহীন। নিজের সন্তানের জন্য মোগল সম্রাট বাবরের ভালোবাসার উদাহরণ ইতিহাস হয়ে আছে। সম্রাট বাবর নিজের সন্তান হুমায়ূনের জন্য নিজের জীবন উত্সর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। বাবা দিবসের প্রাক্কালে সন্তানের সামনে সুযোগ আসে বাবাকে অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা জানানোর। আমাদের সবার উচিত বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। তারা বৃদ্ধ বয়সে যাতে কোনোভাবে অবহেলার শিকার না হন সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। অনেক সন্তান রয়েছে, যারা মা-বাবার দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নয়। মা দিবস বা বাবা দিবস তাদের চোখের সামনের পর্দাটি খুলে ফেলে বাবা-মায়ের প্রতি তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধনকে আরও অনেক সুদৃঢ় করতে বাবা দিবসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের পারিবারিক জীবনে এবং সমাজে বাবার যে গুরুত্ব তা আলাদাভাবে তুলে ধরতেই বাবা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।

গ্রিক কবি হোমারের একটি কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, সেই জ্ঞানী বাবা যে তার সন্তানকে জানেন। যাদের বাবা রয়েছেন কাছে কিংবা দূরে তাদেরকে বাবা দিবসের প্রাক্কালে বিশেষভাবে সম্মান জানানো হলে তারা নিশ্চয়ই খুশি হবেন। আর যাদের বাবা নেই, এর মধ্যেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের স্মরণ করুন শ্রদ্ধাভরে, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষভাবে প্রার্থনা করুন। এ কথা সবাইকে অবশ্যই মানতে হবে, মানবজীবনে বাবার অবদান এবং গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এবারের বাবা দিবসে নিজেদের বাবাকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি, সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাকে স্থান দিই। আমাদের আচরণ যেন কোনোভাবেই তার মনে আঘাত করতে না পারে সেদিকে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে সবাইকে।

Admin ID

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s